কৃষকদের পেঁয়াজ পচনের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিতরণ করা এয়ারফ্লো মেশিনের কার্যক্রমে বড় ধরনের কারিগরি অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই কার্যক্রমে নির্ধারিত ক্ষমতার পরিবর্তে নিম্নমানের মোটর ব্যবহার করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ৩০০ থেকে ৩৫০ ওয়াটের শক্তি সাশ্রয়ী মোটর দেওয়ার কথা থাকলেও মাঠে সরবরাহ করা হয়েছে ৪০০ থেকে ৭৪৬ ওয়াটের অননুমোদিত লোকাল মোটর। এর ফলে কৃষকদের পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়ার বদলে ভোগান্তি অনেকখানি বেড়ে গেছে। সঠিক মাত্রায় আলো ও বাতাস সঞ্চালিত না হওয়ায় ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত পেঁয়াজ পচে যাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। সরকারি এই প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়মের কারণে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। রাষ্ট্রীয় তহবিলের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে তিন হাজারের বেশি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রায় তিন হাজার মেশিন দেওয়া হয়েছে পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য পরিচিত রাজবাড়ী জেলায়। এ ছাড়া নাটোর, ফরিদপুর, পাবনার সুজানগর, মাদারীপুর ও মুন্সীগঞ্জেও এসব মেশিন পাঠানো হয়। জিএসএম ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি স্বীকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সাইফুল আলম জানান, ২১ হাজার টাকা বরাদ্দের এই মেশিনের জন্য শুরুতে ৩০০ থেকে ৩৫০ ওয়াটের মোটর ব্যবহারের কথা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ৭৪৬ ওয়াট সরবরাহের চাপ দেওয়া হয়। এতে নিজের প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তিনি কাজটি থেকে সরে দাঁড়ান বলে জানান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আদর্শ মেশিনের পাইকারি খরচ ১৭ হাজার টাকা হলেও ঠিকাদার ও কর্মকর্তারা মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার লোকাল মোটর দিয়ে নামমাত্র মূল্যে এসব মানহীন মেশিন তৈরি করেছেন। এসব প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারিজ টিউন বা নিবন্ধিত কোনো সমিতির বৈধ ঘোষণাও ছিল না। কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মান যাচাই ছাড়াই মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এসব মেশিন বিতরণ দেখানো হয়েছে। রাজবাড়ী, ফরিদপুর, নাটোর ও পাবনার স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা এবং উপজেলা কৃষি অফিসারদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশেই এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই কারিগরি জালিয়াতির কারণে সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক ও সাধারণ কৃষকরা। অফিশিয়াল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ৩০০ ওয়াটের মেশিন চললে মাসে চার থেকে পাঁচশ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসার কথা ছিল। কিন্তু ৭৪৬ ওয়াটের উচ্চক্ষমতার ও নিম্নমানের মোটর ব্যবহারের ফলে বিদ্যুতের লাইন স্ল্যাব অতিক্রম করে বিল গিয়ে ঠেকেছে ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। এর ফলে পচনের হাত থেকে পেঁয়াজ বাঁচাতে গিয়ে কৃষকদের বাড়তি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে গিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সরকারের সুদূরপ্রসারী সৌরবিদ্যুৎ বা সোলারাইজেশন পরিকল্পনাও এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ৩০০ ওয়াটের মেশিনের ক্ষেত্রে ডিসি প্যানেল ও ইনভার্টার মিলিয়ে কম খরচে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর সম্ভব হলেও ৭৪৬ ওয়াটের মেশিনের ক্ষেত্রে খরচ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত এই ব্যয়ের বোঝা বহন করা সাধারণ কৃষক কিংবা সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে উদ্ভূত এসব অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মাহফুজুর রহমান দাবি করেছেন যে তাদের প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়নি। তিনি জানান, কৃষি প্রণোদনার আওতায় শুরুর দিকে স্পেসিফিকেশন ৩০০ থেকে ৩৫০ ওয়াট থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ৪০০ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ৭৪৬ ওয়াট পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খরচ কিছুটা বেশি হলেও এর মাধ্যমে কৃষকরা পর্যাপ্ত পরিমাণ পেঁয়াজ নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারছেন বলে তিনি দাবি করেন। সরকারের পক্ষ থেকেও এই প্রযুক্তিকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর রশিদ জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও আট হাজার এয়ারফ্লো মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের অধীনে এ সংক্রান্ত একটি নতুন প্রকল্পও কৃষি মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনাধীন ছিল। তবে মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবে এবং অনিয়মের কারণে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নের পরিবর্তে এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।