কৃষি ডেস্ক: সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রতি ১০টি সুন্দরীগাছের মধ্যে প্রায় ৪টি বা ৩৯ শতাংশ গাছ আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে এই বনের প্রায় ৩৩ কোটি সুন্দরীগাছের মধ্যে ১২ কোটি ৯৫ লাখ গাছে এই রোগ রয়েছে, যার মধ্যে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা দুই কোটির বেশি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক কর্মশালায় গবেষণার এই ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, আগামরা রোগের কারণে প্রথমে গাছের পাতা আক্রান্ত হয় এবং পরবর্তীতে ডালপালা ও শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে মূলকাণ্ড ধ্বংস হয়ে যায়। উচ্চ ও মাঝারি মাত্রার লবণাক্ত অঞ্চলে সুন্দরীগাছে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এছাড়া উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণার প্রধান গবেষক ও সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্বপন সরকার জানান, ১৯৮৬ সালের তুলনায় বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ গাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আক্রান্ত গাছের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা জানিয়েছেন, ২৫ শতাংশের কম আক্রান্ত গাছ রয়েছে আট কোটির বেশি এবং সম্পূর্ণ মূলকাণ্ডসহ ৫০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত গাছের সংখ্যা দুই কোটির কাছাকাছি। এই বিপুল পরিমাণ গাছ অসুস্থ থাকায় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের হার এবং কার্বন শোষণের ক্ষমতা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এছাড়া বনের প্রতি হেক্টরে চারার ঘনত্বও আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে। বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানিয়েছেন, টপ-ডাইং সুন্দরবনের একটি শতাব্দীপ্রাচীন সমস্যা এবং অতীতে আক্রান্ত গাছ কেটে ফেলার পদ্ধতি কার্যকর না হওয়ায় তা বন্ধ করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরীগাছের এই দুর্দশা চলতে থাকলে সুন্দরবনের আচ্ছাদন, কার্বন সঞ্চয় ক্ষমতা এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান বলেন, সুন্দরবনের প্রধান প্রজাতি সুন্দরী কমে যাওয়ার ফলে অনেক স্থানে সিংড়া, আমুর ও গরানের মতো ছোট প্রজাতির বিস্তার ঘটছে। বন ও বন্য প্রাণীর ওপর এসব পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব জানতে এবং সুন্দরবন রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিক গবেষণার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।








